হযরত ওয়ায়েস কারণী (রঃ)।। ৩য় অংশ

ওয়ায়েস কারণী (রঃ)-এর সামনে হযরত ওমর (রাঃ)-এর খেলাফত তুচ্ছ মনে হলঃ

ছিন্নবস্ত্র পরিহিত এ মানুষটির অন্তজ্যোতি উপলব্ধি করে হযরত উমর (রাঃ) অভিভূত ও ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়লেন। সামান্য একটি লোক অথচ কী অসামান্য। সাধারন একটি মানুষ অথচ অসাধারণ। এর তুলনায় তুচ্ছ তাঁর খিলাফত তাঁর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য। বিতৃষ্ণায় তার মন ভরে উঠল। তখন হযরত উমর (রাঃ) বললেন, এমনকি কেউ আছে যে, একখানি রুটির বিনিময়ে খিলাফতের দায়িত্ব নিতে পারে?

তাঁর এই স্বগোক্তি শুনে ওয়ায়েস কারণী (রঃ)বললেন, যে বোকা, শুধু সে-ই নেবে। সত্যিই যদি মন না চায়, তাহলে ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেই তো হয়। যার মন চায়, সে কুড়িয়ে নেবে। ওসব বিনিময়ের কথা কি বলছেন?

এ কথা বলে তিনি এবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রদত্ত পোশাক পরম ভক্তিভরে পরিধান করলেন। তারপর বললেন, আল্লাহ এ অধমের প্রার্থনায় প্রতিশ্রিতি দিয়েছেন যে, রাবী ও মোজার কবিলার ছাগ-লোমের তুল্য নবীজীর উম্মতকে মার্জনা করবেন।

হযরত উমর (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এই মহাতাপসের আত্নিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁরা বিষ্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে হযরত উমর (রাঃ)বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রতি আপনার এমন গভীর ভালবাসা, অথচ আপনি একবার নিজে গিয়ে তাঁকে দর্শন করেননি কেন?

ওয়ায়েস কারণী (রঃ)-এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন,আচ্ছা, আপনারা তো তাঁকে দেখেছেন, তাই না?

হ্যাঁ! দেখেছি।

মনে হয় আপনারা কেবল তাঁরা জোব্বাই দেখেছেন। তাঁকে ঠিক দেখেননি। বলুন তো, তাঁর পবিত্র ভুরূ দু’টি জোড়া ছিল না আলাদা?

প্রশ্ন শুনে তাঁরা অপ্রস্তুত। আশ্চর্যএর কথা, দু’জনের কেউই ওয়ায়েস কারণী (রঃ)- এর প্রশ্নের উত্তর দিতে পরলেন না।

তিনি আরো প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, মনে হয় প্রিয় নবীর ওপর আপনাদের গভীর ভালোবাসা ছিল, তাই না? নিশ্চয়। আর সে ভালোবাসা এখনো অটুট। তাই যদি হয়, তাহলে আপনাদের দু’জনের মুখে এখনও দাঁতগুলো রয়েছে কিভাবে? ওহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দাঁতগুলি ভেঙে গেল, অথচ সমব্যথী হয়ে আপনাদের দাঁতগুলি ভেঙে ফেলতে পারলেন না। অথচ এখনো দাবে করেন, তাঁর প্রতি আপনাদের ভালোবাসা অটুট। আর শুনুন, আমি তাঁকে কোনদিন চোখে দেখিনি। ওহুদের যুদ্দে তাঁর কোন দাঁতটি ভেঙে পড়ে, তাও দেখিনি। কিন্তু যখন শুনলাম যুদ্ধে নবীজীর দাঁত ভেঙে গেছে, তখন ভাবলাম তাঁর মুখে তো এখন দাঁত নেই, তাহলে আমি আমার দাঁত রাখি কোন মুখে?  মনে হওয়ামাত্র একটি দাঁত উপড়ে দিলাম। পরক্ষণে মনে হল, তাঁর ঠিক কোন দাঁতটি ভেঙে গেছে তা তো জানি না। হয়তো সে দাঁতটি এখনো রয়েছে আমার মুখে। এ সংশয় দূর করার জন্য আমি সব দাঁতগুলোই তুলে ফেলেছি।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রিয় দুসহচর ওয়ায়েস কারণী (রঃ)-এর এ বিবরণ শুনে শুউরে উঠলেন। এও কি সম্ভব? অথচ শুধু সম্ভব না, সত্য। ভালোবাসা, ভক্তি কাকে বলে, ওয়ায়েস কারণী (রঃ)তার এক প্রদীপ্ত প্রমাণ। আন্তরিক অকপট, নির্মল ভালোবাসার এ নমুনা দেখে তাঁরা স্তম্ভিত। চোখের আড়ালে যিনি ছিলেন, তিনি কেমন করে সমগ্র চেতনা জুড়ে চৈতন্যময় হয়ে উঠেছেন। হযরত উমর (রাঃ) ও আলী (রাঃ) এই মহান প্রেমিকের কাছে কিছু শিক্ষা নিতে চাইলেন। বিনীত কণ্ঠে বললেন, জনাব আমাদের জন্য দোয়া করুন।

ওয়ায়েস কারণী (রঃ)বললেন, আমার ঈমান অনুরাগহীন । তবুও দোয়া করছি। প্রতি ওয়াক্ত নামাযে এ দোয়াই করে থাকি-প্রভু গো! বিশ্বাসী নর ও নারীকে আপনি ক্ষমা করুন। হযরত উমর (রাঃ)-কে বললেন, যদি ঈমান সহকারে কবরে যেতে পারেন, তাহলে দোয়া নিজেই আপনাকে খুঁজে নেবে।

হযরত উমর (রাঃ) বললেন, আরো কিছু বলুন।

ওয়ায়েস কারণী (রঃ)-বললেন, হে আমিরুল মুমুনীন আপনি কি আল্লাহকে চিনেছেন?

উত্তর আসলো, হ্যাঁ চিনেছি।

যদি চিনে থাকেন, তাহলে অন্য কাউকে যেন না চেনেন, না জানেন। তবে তাই হবে আপনার পক্ষে সবচেয়ে ভাল। আরো কিছু বলুন।

আল্লাহ কি আপনাকে চেনেন, জানেন।

তা তো অবশ্যই।

একমাত্র তিনি ছাড়া অন্য কেউ যদি আপনাকে না জানেন, তো খুব ভালো কথা।

এ কথার পর হযরত উমর (রাঃ) বললেন, দাঁড়ান, আপনার জন্য আমি কিছু নিয়ে আসি। আল্লাহ ও রাসূলপ্রেমী লোকটি তথন জামার পকেট থেকে দু’টি পয়সা বের ক্করে বললেন, উট চরিয়ে আমি এ পয়সা রোজগার করেছি। যদি আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারেন যে, এ পয়সা খরচ করার পরও আমি বেঁচে থাকবো, তাহলে আমারও কিছু জিনিস-পত্রের প্রয়োজন হবে। তার মানে, জীবন কখন শেষ হয়ে যায় কেউ জানে না। সুতরাং কোন কিছু সঞ্চয়েরও প্রশ্ন আসে না। অথ্যাত, খলিফার কাছ থেকে ওয়ায়েস কারণী (রঃ) কিছু নিতে অস্বীকার করলেন। পরে দুমহান অতিথির উদ্দেশ্যে বললেন, এখানে আসার জন্য অনেক দুঃখ-কষ্ট পেয়েছেন। আমিও আপনাদের কম দুঃখ দেইনি। আশা করি আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন। এখন আপনার বিদায় গ্রহন করুন। রোজ কিয়ামত খুব আছে। আল্লাহর রহমতে সেদিন আবার দেখা হবে। আর তখন আমাদের সান্নিধ্য-সংস্পর্শ দীর্ঘস্থায়ী হবে।

আমি এখন আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহে খুবই ব্যস্ত। এ কথা বলে, হযরত উমর (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) কে তিনি বিদায় জানালেন। তারপর নিজেও সেখান থেকে চলে গেলেন।

বস্তুত এ সাক্ষাতের পর থেকেই হযরত উমর (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গী হযরত আলী (রাঃ)- এর মাধ্যমে ওয়ায়েস কারণী (রঃ)এর নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এজন্য আত্ননিবেদিত দরবেশের গোপন-গভীর নীরব সাধনায় বিঘ্ন দেখা দিল। তখন তিনি ঐ এলাকা ত্যাগ করে কুফায় চলে যান। শোনা যায় এরপরে হারম ইবনে জামান ছাড়া আর কারও সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়নি।

ইবনে জামান ও ওয়ায়েস কারণী (রঃ)- লোকমুখে ওয়ায়েস কারণী (রঃ)-এর নাম শুনে তাঁকে একনজর দেখার জন্য খুবই উতালা হয়ে উঠলেন ইবনে জামান। তাঁর শারীরিক বর্ণনা জানা ছিল। একদিন ফোরাত নদীতে তিনি তাঁকে অযু করতে দেখলেন। আর চিহ্নগুলো মিলিয়ে নিলেন মনে মনে। বুঝলেন, যাঁকে তিনি খুঁজছেন, ইনিই তিনি। ইবনে জামান তাঁকে ছালাম জানিয়ে করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন।

তিনি সালামের জবাব দিলেন। কিন্তু করমর্দন করলেন না। ইবনে জামান দেখলেন, কী অপরিসীম দারিদ্র ও দৈন্যদশায় ক্লিষ্ট হয়েছেন ওয়ায়েস কারণী (রঃ)। দারিদ্র্য-জর্জর লোকটিকে দেখে ইবনে জামানের চোখে পানি এল। তিনি কাঁদলেন। কাঁদলেন ওয়ায়েস কারণী (রঃ)ও। ইবনে জামান বললেন, আল্লাহ আপনার প্রতি করূণা বর্ষণ করুন।

ওয়ায়েস কারণী (রঃ) বললেন, হে হারম ইবনে জামান! আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবি করুন। আপনি কি জন্য এখানে এসেছেন? আর আমার সন্ধানই বা পেলেন আর কাছে? ইবনে জামান তাঁর কথা শুনে বিষ্মিত হয়ে বললেন, জনাব আপনি আমার ও আমার পিতার নাম জানলেন কি করে? এর আগে তো আপনি আমাকে কখনো দেখেননি। হয়তো আমার কথা কখনো আরো কাছে শুনতেও পাননি। ওয়ায়েস কারণী (রঃ) বললেন, যার জ্ঞানের অগোচর কিছুই নেই, তিনিই আমাকে জানিয়েছেন। আমার আত্না আপনাকে চিনেছে। তারপর ইবনে জামান মহান তাপসকে অনুরোধ করলেন, দয়া করে রাসূলে কারীম (সাঃ) সম্পর্কে কিছু বলুন। ওয়ায়েস কারণী (রঃ) বললেন, আমি তাঁকে নিজের চোখে দেখিনি।কিন্তু তার পূত-পবিত্র বানী অন্যের মুখে শুনেছি। আমি মুহাদ্দিস বা ভাষ্যকর হতে চাইনি। আমার অন্য কাজ  আছে।আপনি যদি পবিত্র কুরআনের কিছু আয়াত পাঠ করে শোনান তো আমি শুনি। ইবনে জামানের অনুরোধে ওয়ায়েস কারণী (রঃ)পাঠ শুরু করলেন, “আউযুবুল্লাহি মিনাশ শায়ত্বনির রাজিম।“ এটূকু উচ্চারণ করেই তিনি আকুলভাবে কাঁদতে কাঁদতেই পাঠ করে গেলেন, “অমা খালাক্কাতুল জ্বিন্না ইল্লা-লিইয়া বুদুন”।–আমি জ্বিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদত করার উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি।

আয়াতটি পাঠ করেই তিনি জোরেশোরে চিৎকার করে উঠলেন। মনে হল, তিনি বুঝি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু না। ইবনে জামানের উদ্দেশ্যে বললেন, বলুন, কি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন? আপনার প্রতি আমার ভক্তি ও ভালোবাসাই আমাকে এখানে টেনে এনেছে।

যিনি আল্লাহকে চিনেছেন, তিনি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে ভালোবাসা করে শান্তি পেয়েছে বলে আমার জানা নেই। জেনে রাখুন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সজ্ঞে বন্ধুত্ব স্থাপন করে কেউ কোনদিন সুখী হতে পারে না। এ ধরনের কথাবার্তার পরে ইবনে জামান আবার অনুরোধ করলেন, দয় করে আমাকে কিছু উপদেশ দান করুন।

চতুর্থ অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *